প্রসঙ্গ: চাঁদ দেখা কমিটি সংস্কার || বাপ্পা আজিজুল || মানসলোক ||



প্রসঙ্গ: চাঁদ দেখা কমিটি সংস্কার 

বাপ্পা আজিজুল 

মুনসাইটিং.কম বলছে, বিশ্বের ৪৩ টি দেশ চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অনুসরণ করে। মানে সৌদিতে যেদিন ঈদ, তাদেরও সেদিন ঈদ। ১৬ টি দেশ তুর্কিয়েকে মেনে চলে। ৩৯ দেশ তার মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, ইরাকের মতো কয়েকটি মুসলিম দেশ স্থানীয় চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। ১৮ টি দেশের চাঁদ দেখার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা ও ক্রাইটেরিয়া আছে যেমন- মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি। কথা হল যেসকল দেশ সৌদি ও তুর্কিয়েকে ফলো করছে তাদের দেশের ফকিহদের যুক্তি কী? সেখানে কী ভালো মানের ফকিহ নেই? আবার যারা নিজেদের লোকাল চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল তারা লোকালি কতটা স্ট্রং? স্ট্রং এনাফ না হলে অন্যের এক্তেদা করা উচিত। যেমন আমরা নিজেরা মুজতাহিদ এর যোগ্য নই বলে মাজহাব বা ইমামদের মানি। কথা কী ক্লিয়ার? অথবা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, লোকবল, যন্ত্রপাতি, ক্রাইটেরিয়া সেটাপ করে দেখাইতে হবে আমরা সৌদি, তুর্কিয়েকে গুনি না!



খালি চোখে চাঁদ দেখার যে হাদিসটা, সেটা কী এখনও খালি চোখ মিন করবে? তাহলে খালি গলায় আযান দিতে হবে, খালি কানে না শুনলে এক্তেদা করা যাবে না। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কাজে লাগানো গেলে এখানে কেন লাগানো হচ্ছে না? কেন সেরকম ইন্সট্রুমেন্ট নাই বা কেনা হচ্ছে না?


ইন্ডিয়াতে 'হিজরি কমিটি অব ইন্ডিয়া' নামে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান আছে যার সদর দফতর কেরালাতে। চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত তারাই দেয়। তাদের ওয়েবসাইট ভালোই। তারা প্রস্তাব করছে সারাবিশ্বে একটি মাত্র ইসলামি ক্যালেন্ডার হবে। একই দিনে সবাই রোযা রাখবে, ঈদ করবে। https://hijricalendar.in/?page_id=1364


আমাদের দেশে Bangladesh Astronomical  Association (BAA) আছে। এরকম আরও সোসাইটি আছে।  BAA এর অনেক কর্মসূচি, পাবলিকেশন আছে। 'মহাকাশবার্তা' নামে দ্বিমাসিক পত্রিকা আছে, ইংরেজি রিসার্চ জার্নাল আছে। তারা বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, ফেস্টিভাল ও অলিম্পিয়াড করে। তাদের অনেক বড় একটা প্রোগ্রাম সানফেস্ট যা তারা নিউ ইয়ারে করে। বাট তাদের মুনফেস্ট নামে কোন কর্মসূচি নাই। সেলুকাস! সেক্যুলারদের দেখে তো আমরা অনেক কিছুই করি। স্টার, আই, প্রথম আলোদের দেখে কত ধরণের অলিম্পিয়াড ইসলামপন্থীরা করতেছে। এই সেক্টরে নিয়ে কেউ এখনও ভাবেনি। আমাদের একটা এস্ট্রোনমি সোসাইটি হোক। ঈদের/মহরমের চাঁদ দেখা নিয়ে মুনফেস্ট হোক!


আমাদের আল হেলাল কমিটি: ১৭ জন সদস্য, আমলা, কিছু সরকারি আলেম দিয়ে ভরা। ২০০০/- ভাতা পান তারা। ইফার আন্ডারে চলে। এটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বিনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগ। আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি মাসের ২৯ তারিখ জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কমিটির সব সদস্যের অংশ নেওয়ার নিয়ম। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভাপতি ধর্ম উপদেষ্টা। অন্য সদস্যরা হলেন- ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, তথ্যসচিব, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের ওয়াকফ প্রশাসক, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক, বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ঢাকার জেলা প্রশাসক, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার অধ্যক্ষ, বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব, লালবাগ শাহী জামে মসজিদের খতিব, চকবাজার শাহী জামে মসজিদের খতিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক। এছাড়া, চাঁদ দেখার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সাত সদস্য বিশিষ্ট উপ-কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় ধর্মমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে তিনিই কার্যক্রম শুরু করেন। তার অনুপস্থিতিতে সভাপতিত্ব করেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব। তাদের একজন প্রথমে মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠানের (স্পারসো) প্রতিনিধির কাছে চাঁদের সম্ভাব্য বয়স সম্পর্কে জানতে চান। এরপর বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিনিধির কাছ থেকে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি, কোথায় মেঘ আছে, কোথায় নেই, কোন জেলার আকাশ পরিষ্কার ইত্যাদি জানতে চাওয়া হয়। এরপর তারা বসে থাকেন জেলাগুলোর চাঁদ দেখা কমিটির ফোনের অপেক্ষায়। জেলা থেকে ফোন আসার আগ পর্যন্ত মূলত কোনো কাজ থাকে না এই কমিটির। নেই কোন নিজস্ব লোকবল, যন্ত্রপাতি, গবেষণা কিংবা ওয়েবসাইট। এতটায় ঠুনকো মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টটা?আমরা খুব কিউট হয়ে জাতি সরকারের সাফাই গাইতে খুঁজে খুঁজে হাদিস বের করছি। অথচ রাষ্ট্র কিংবা সরকারকে প্রশ্ন করতে পারছি না- চাঁদ দেখার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত ও আপডেটেড যন্ত্রপাতি নাই কেন?


ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা শপথ নেয়ার পরপরই (১৩ আগস্ট, ২০২৪) আমি ৫ দফা দাবি ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করি। পরবর্তীকালে (২৭ অক্টোবর, ২০২৪) তাঁর হাতে লিখিত কপি হস্তান্তর করি। যেখানে ৩ নং দাবি ছিল- "জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটিকে ঢেলে সাজানো। আমলা নির্ভরতা বাদ দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নেয়া। ইফার সংস্কৃতি বিভাগের অধীনে কমিটি না রেখে সরাসরি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধিদফতর মর্যাদায় নেয়া। অথবা ভারতের ন্যায় আলাদা ইনস্টিটিউট করা যেতে পারে। উপযুক্ত লোকবল ও সরঞ্জাম-প্রযুক্তি নিশ্চিত করা"। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ধর্ম উপদেষ্টা মহোদয়সহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। 





No comments

Theme images by A330Pilot. Powered by Blogger.